Ultra Protagonist's World

প্রারম্ভিক

রান্নার রেসিপিঃ আলু – মটরশুঁটি দিয়ে ছাগলের মেটের ডালনা

রান্না – বান্না করতে দুর্দান্ত লাগে, কিন্তু বিশ্বাস করুন রান্না সংক্রান্ত বিষয়ে কারোকে জ্ঞান দিতে একদম ভালো লাগে না । তার মানে এই নয় যে আমি রান্নার ব্যাপারে সত্যি সত্যিই ভীষণ অহংকারী বা আমার কোনও গোপন রেসিপিজগত আছে । এই প্রতিযোগিতার যুগে নিজেকে চাগিয়ে রাখার জন্যে নিজেই নিজেকে তেল মেরে অনেক সময় জবরদস্ত রাঁধুনি বলে থাকি বটে, কিন্তু সেসবই নেহাত মজা করবার জন্যে। আসলে রান্না নিয়ে কচকচাতে না চাইবার প্রধান কারণ আমার একটা ছোট্ট কিন্তু পোক্ত বিশ্বাস  – আপ রুচি খানা । নিজে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিজের জিভকে তুষ্ট করার চেষ্টা করাই সর্বোত্তম পন্থা । বিশ্বাস করুন আমি খেতে খুব ভালো বাসলেও বছর পাঁচেক আগে অবধি কোনও রান্না-বান্না জানতাম না। জানবোই বা কি করে ? মা কোনোদিন রান্নাঘরে ব্যাটাছেলেদের ঢোকা এবং খবরদারি ফলানো পছন্দ করতেন না । বাড়ির বড়বাবু মানে আমার বাবারই সে জগতে প্রবেশ বলতে গেলে প্রায় নিষিদ্ধ ছিল, তো আমি কোন ছার !
বাড়ি থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকার কালে এ হেন নিষিদ্ধজগতের তথা রান্নাঘরের ‘বেতাজ বাদশা’ হয়ে ওঠার পথ খুব মসৃণ না হলেও আমাকে কোনোদিন খুব বেশি একটা ভুগতে হয়নি । রান্না করতে গিয়ে অনেকে একেবারে ‘হাত পুড়িয়ে খাবার’ অবস্থায় যে পৌঁছে যান , সে ঘটনাও আমার সাথে ঘটেছে বলে মনে পড়ে না । হ্যাঁ দু- একবার রান্না পুড়িয়ে ফেলেছি বই কি , তবে সে দুর্ঘটনা রান্না চাপিয়ে দিয়ে খোশগল্প করতে করতে রান্নার কথা একেবারে ভুলে মেরে দেবার কারণে । স্বাদ কোরকের কথা মন দিয়ে শুনেছি, রান্নার পথ আমায় স্বাদ কোরকই দেখিয়েছে । এছাড়া যাঁদের কথা শুনেছি বা মেনেছি তাঁরা হলেন আমার দিদিমা , আমার মা, রন্ধন বিশারদ শউকত উসমান সাহেব , রন্ধন পটীয়সী শ্রীমতি নীতা মেহতা এবং সর্বোপরি কিছু অংশে সঞ্জীব কাপুর ।
বাকিটা নিজের বোধ- বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে এখনো অবধি যা বানিয়েছি তা খেয়ে কেউই অখুশি হয়ে ফিরে যাননি , মা কালীর দিব্যি । কালী মা- র আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে আজ যে পদটির কথা সংক্ষেপে একটু বলে দিতে চাইব সেটা হল – আলু ও মটরশুঁটি সহযোগে ছাগলের মেটের ডালনা ।
প্রথমেই বলে রাখি যে আমরা তিন যুবক মিলে পদটি খাবার কথা ভেবেছিলাম। তাই এই রান্নার মাপজোখ তিন গড়পড়তা বাঙালি জোয়ান পুরুষপুঙ্গবের হিসেবে করা । এর উপরে স্কেল আপ – ডাউন করে নেবার দায়িত্ব কারিগরের ।
রান্নার উপকরণঃ  ছোট ও পাতলা টুকরো করে কাটা পাউন্ড খানেক ছাগলের মেটে, এক খানা বেশ বড় সাইজের লাল পেঁয়াজ ( এই পেঁয়াজের ঝাঁজ সবচাইতে বেশি, তাই এ ধরনের রান্নার পক্ষে সবথেকে উপযোগী), একটা বড় আলু (চন্দ্রমুখী নিলে ফোটানোর সময় আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে, না হলে গলে যাবে), একটা টম্যাটো , মটরশুঁটি ( ক্যানড বা কেনা কাঁচা সবজি) আদা ও রসুনের পেস্ট ( বাজার থেকে কিনে থেঁতো করে নিতেও পারেন, তবে রেডিমেড কিনে নিলে খাটনি কমবে এই আর কি । অবিশ্যি মিক্সি থাকলে তো কেল্লাফতে – মিক্সিতে পেস্ট করা আদা – রসুনের ফ্লেভার বেস্ট) , খান দুই তিনেক কাঁচা লঙ্কা , লাল লঙ্কার গুঁড়ো, হলুদ গুঁড়ো , ধনে গুঁড়ো , জিরে গুঁড়ো , গুঁড়ো গরমমশলা ( গোটা গরমমশলা থাকলেও হবে, একটু ট্রিটমেন্টে তফাত হবে সেক্ষেত্রে , সে প্রসঙ্গে পরে আসছি ), লবণ ( টেবিল সল্ট) এবং অতি অবশ্যই সরষের তেল ।
রন্ধন প্রণালীঃ প্রথমে টুকরো করে কাটা মেটে কে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে । যকৃত এক অতি বিশ্রী প্রত্যঙ্গ (খাবার জিনিস নিয়ে এ প্রসঙ্গে আর বিশদে গেলাম না) । ছাগলের অন্যান্য প্রত্যঙ্গের চাইতে যকৃত বেশি ভালো করে পরিষ্কার করা বিশেষ দরকারি । পরিষ্কার করার পর মেটের টুকরো গুলির ওপরে আদা-রসুনের পেস্ট , হলুদ গুঁড়ো , লাল লঙ্কার গুঁড়ো ও পরিমাণ মতো লবণ ছড়িয়ে দিন। এর ওপরে সরষের তেল ছড়িয়ে উপরোক্ত সমস্ত উপকরণ সমেত মেটের টুকরো গুলিকে ভালো করে মাখুন। এটি হল আপনার ম্যারিনেড মিক্সচার । এটিকে ঢাকা দিয়ে আধ ঘণ্টার জন্যে রেখে দিন ।
পেঁয়াজ টিকে লম্বা লম্বা পাতলা স্লাইসে কেটে ফেলুন, আলু কেটে ফেলুন ছোট ছোট চৌকো টুকরো করে (ঘুগনিতে দেওয়া টুকরোর থেকে সামান্য একটু বড় রাখুন)। অল্প তেলে আলুর টুকরোগুলিকে ভাজতে থাকুন এবং হালকা বাদামী রং এসে গেলে তুলে রেখে দিন একটি পাত্রে । টম্যাটো কেটে ফেলুন ।মটরশুঁটি ছাড়িয়ে ধুয়ে ফেলুন । মশলাপাতি রেডি করে ফেলুন ( আপনাকে আধঘণ্টা কাটাতে হবে এইসব করে আর কি ! ) ।
আধঘণ্টার মাথায় ম্যারিনেড মিক্সচার নিয়ে আপনার খেলা শুরু । মেটের পাত্রে হাত দেবার আগে কড়াই তে সরষের তেলে ঢেলে তেল গরম করুন । এরপর ম্যারিনেড মিক্সচার টা গরম তেলে ঢেলে দিন । এখানে একটা ফুটনোট যোগ করার আছে । আপনি আদা- রসুনের পেস্ট কম দিলে মেটে ভাজার পর ক্বাথ টা গা মাখা হবে। আমার একটু গ্রেভি ভালো লাগে বেশি তাই বেশি ক্বাথের লোভে আমি আদা-রসুন পেস্ট বেশি দিয়ে থাকি । এবারে মিনিট দশেক মেটেটা রান্না করুন । দেখবেন, মেটেটা আবার খুব কড়া ভাজা হলে শক্ত রাবারের মতো আর কালো হয়ে যাবে । মেটে রান্না হয়েছে অথচ নরম আছে এরকম অবস্থায় তুলে নিন একটি পাত্রে। আপনি আদা- রসুনের পেস্ট বেশি ব্যবহার করে থাকলে ( আমার রাস্তায় হেঁটে থাকলে) ক্বাথ বেশি জমবে , কড়াই থেকে সেটিও তুলে কোথাও একটা সংগ্রহ করে রাখুন ( মেটে যেখানে রাখলেন সেখানেই তুলে রাখতে পারেন) । পরে ঠিক সময়মতো এটির ক্যামিও আপিয়ারেন্স হবে । (ক্বাথ তুলে না নিলে যেটা হবে তা হল পেঁয়াজ ভাজার সময় পেঁয়াজটা জলজলে পরিবেশে ভেপে সেদ্ধ হবে , ভাজাটা আর ঠিকঠাক হবে না । )
এইবারে আপনি আরেক প্রস্থ সরষের তেল ঢালুন । কড়াই আপনার তেতেই আছে, তবুও তেল গরম হতে মিনিট পাঁচেক সময় দিন । এই সময়ে দারচিনি গুঁড়ো করে গরম তেলে ছেড়ে দিন । এরপর তেলে পেঁয়াজ ছেড়ে দিন, কাঁচা লঙ্কা কুচিয়ে দিয়ে দিন । নাড়তে থাকুন । একটু পরেই কাঁচা লঙ্কার একটা গন্ধ বেরোবে । এই সময়ে টম্যাটো কুচি যোগ করে দিন। নাড়তে থাকুন । পেঁয়াজ বাদামী হলে আস্তে আস্তে গুঁড়ো মশলা গুলো দিয়ে দিন । পরিমাণ আপনার পছন্দের ওপরে নির্ভর করছে । তবে এক পাউন্ড মেটের জন্যে ধনে আর জিরে গুঁড়ো দেড় চা চামচের বেশি না যাওয়াই ভালো । লাল লঙ্কা ঝাল বুঝে দিন। হলুদ আন্দাজ মতো ছড়িয়ে দিয়ে দেখুন । গুঁড়ো গরম মশলাও দিয়ে দিন । একটু জল মেশান। নাড়তে থাকুন। এক দফা জল শুকোলে আবার একটু জল দিন, ভালো করে মশলাটা কষান । অল্প নুন দিয়ে দিন ।  কষাতে থাকুন। বেশ ঘন বাদামী একটা রং ধরে এলে মটরশুঁটি আর মেটে দিয়ে দিন, ক্বাথটাও যোগ করে দিন । খুব বেশি জল মেশাবেন না, কারণ তাহলে ঝোল শুকোতে জান কয়লা হয়ে যাবে। ফলতঃ অধিক চেষ্টায় মেটে- আলু সব কিছুরই বারোটা বেজে যাবে । আলু যোগ করার আগে মিনিট দশেক মেটেটা রান্না করুন । আলু ভাজা হয়ে আছে , ভয় নেই। একটু জুস বেড়িয়ে এলে আলু দিয়ে, নুন পরখ করে পরিমাণ মতো লবণ দিয়ে মিনিট পনেরোর জন্যে ঢাকা দিয়ে দিন । এরপরে যখন খুলবেন ততোক্ষণে যেন আপনার ভাত তৈরি থাকে , না হলে দেহে – মনে কষ্ট পাবেন ।

নিজে খান , অন্যদেরও খাওয়ান । ভালো থাকুন ।

Advertisements

About Anand Sehgal

A graduate researcher, A writer, A poet, A singer, A composer,An actor..............An artist by heart

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Information

This entry was posted on August 11, 2015 by in Uncategorized and tagged , , .
%d bloggers like this: